সুশান্ত কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা, আলীকদম;

বান্দরবানের আলীকদমের দুর্গম ম্রো পল্লীগুলোতে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ‘প্লুং’ নামের বিশেষ বাঁশির সুরে মুখর হয়ে ওঠে পরিবেশ। ম্রো জনগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ, শিশু থেকে বয়োবৃদ্ধ—সবাই এই বাঁশির সুর ও ছন্দের তালে দল বেঁধে নৃত্য পরিবেশন করেন।

বিশেষ কোনো উৎসব হলে তো কথাই নেই—গভীর রাত পর্যন্ত ক্লান্তিহীনভাবে চলে নাচ-গান। পাহাড়ের এক পাড়া থেকে আরেক পাড়ায় ভেসে যায় প্লুংয়ের মাদকতাময় সুর। অতিথি বরণেও এই বাঁশির ব্যবহার ম্রো সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ম্রো জনগোষ্ঠীর ভাষায় এ বাঁশির নাম ‘প্লুং’। একটি লাউয়ের খোল এবং কয়েকটি বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি করা হয় এই বাদ্যযন্ত্র। লাউয়ের খোলে ছিদ্র করে তাতে চার বা ছয়টি বাঁশের কঞ্চি বসানো হয় এবং মৌচাকের মোম দিয়ে আটকানো হয়। ফুঁ দিলে ভেতরে কম্পনের মাধ্যমে সুর তৈরি হয়, আর আঙুলের স্পর্শে সেই সুরের ভিন্নতা আসে।

গো-উৎসবসহ বিভিন্ন বিশেষ অনুষ্ঠানে ‘প্লুং’ বাঁশির সুরে রাতভর নৃত্য চলে। ম্রোদের কাছে এটি শুধু একটি বাদ্যযন্ত্র নয়, বরং তাদের ইতিহাস, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির প্রতীক।

আলীকদম ৪ নম্বর কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্রাত পুং ম্রো জানান, প্লুং বাঁশিকে ঘিরে ম্রো সম্প্রদায়ের মধ্যে দুটি প্রচলিত কাহিনি রয়েছে, যা কলেরা মহামারির সঙ্গে সম্পর্কিত। এক কাহিনিতে বলা হয়, একসময় পাহাড়ের একটি গ্রামে কলেরা ছড়িয়ে পড়লে এক প্রবীণ ব্যক্তি স্বপ্নে নির্দেশ পেয়ে লাউয়ের খোল ও বাঁশের কঞ্চি দিয়ে একটি বাঁশি তৈরি করেন। সেই বাঁশি বাজিয়ে গ্রাম প্রদক্ষিণ করলে সবাই সুস্থ হয়ে ওঠেন। এরপর থেকেই এ বাঁশির নাম হয় ‘রিনা প্লুং’—যেখানে ‘রিনা’ মানে কলেরা।

অন্য একটি কাহিনিতে বলা হয়, এক ম্রো যুবক কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মৃত ভেবে দাহ করতে নেওয়া হলে অলৌকিকভাবে জীবিত হয়ে ওঠেন। পরে তিনি একটি বিশেষ বাঁশি তৈরি করেন, যা থেকে ‘রিনা প্লুং’ নামের উৎপত্তি। এ কাহিনির উল্লেখ রয়েছে লেখক সিংইয়ং ম্রোর ‘ম্রো জনগোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতি’ গ্রন্থে।

ম্রো সম্প্রদায়ের প্রবীণদের মতে, এসব কাহিনির নির্দিষ্ট সময়কাল জানা না গেলেও ধারণা করা হয়, এগুলো কয়েকশ বছর আগের ঘটনা। এখনো বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের চিন ও রাখাইন অঞ্চলে বসবাসরত ম্রোদের মধ্যে এ গল্পগুলো প্রচলিত রয়েছে।

ম্রো বাঁশি নির্মাতা চিংতুই ম্রো জানান, ছোট আকারের বাঁশি তিন থেকে ছয় ইঞ্চি, মাঝারি আকারের ১২ থেকে ২৬ ইঞ্চি এবং বড় বাঁশি ১৮ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। বড় বাঁশির সুর অনেক দূর থেকেও শোনা যায়। সবগুলো একসঙ্গে বাজালে মনে হয় যেন পাহাড় কেঁপে উঠছে।

তিনি আরও বলেন, শুকনো লাউয়ের খোলের দুই পাশে ছিদ্র করে পাঁচ বা ছয়টি বাঁশের কঞ্চি বসিয়ে মৌচাকের মোম দিয়ে আটকানো হয়। প্রতিটি কঞ্চিতে ছোট ছোট ছিদ্র থাকে, যেগুলো আঙুল দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে বিভিন্ন সুর ও ছন্দ তৈরি করা হয়।

কারিগরদের মতে, লাউয়ের খোল ও বাঁশ প্রস্তুত করতে সময় লাগে। উপকরণ প্রস্তুত থাকলে একদিনে কয়েকটি ছোট বাঁশি তৈরি করা সম্ভব। প্রতিটি বাঁশির আলাদা নামও রয়েছে—যেমন প্লুং কাকমা, প্লুং ক্লাং, তিংতেং প্লুং, রিনা প্লুং, পুরুই প্রভৃতি। নৃত্য, উৎসব, কলেরা স্মরণ বা বিশেষ আচার—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভিন্ন ভিন্ন প্লুং ব্যবহৃত হয়।

ম্রো জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম বাহক এই ‘প্লুং’ বাঁশি আজও পাহাড়ি জীবনের আনন্দ, ইতিহাস ও বিশ্বাসকে বহন করে চলেছে।